কলকাতার ১০টি অবশ্যই ঘোরার জায়গা:
কলকাতা শুধু একটা শহর নয়, এটা একটা অনুভব। এখানে আছে পুরনো দিনের ইতিহাস, মজার খাবার, নানা রকম সংস্কৃতি আর অনেক ভালোবাসার গল্প। যারা বাইরে থেকে কলকাতায় ঘুরতে আসেন, বা যাঁরা এখানেই থাকেন কিন্তু সব জায়গা এখনো ঘোরা হয়নি — তাঁদের জন্যই এই ব্লগটা। চলো, জেনে নিই কলকাতার ১০টি সবচেয়ে সুন্দর ও জনপ্রিয় ঘোরার জায়গা।
১. ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
 |
| source- wikipedia |
এই সাদা মার্বেলের বাড়িটা ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল রানি ভিক্টোরিয়ার স্মরণে। এখন এটি একটি বড় মিউজিয়াম, যেখানে পুরনো দিনের অনেক ছবি, বই, অস্ত্র আর ইতিহাসের নানা জিনিস রাখা আছে। এখানে ঘুরে অনেক কিছু শেখা যায় — বিশেষ করে স্কুল ও কলেজ পড়ুয়াদের জন্য এটা এক দারুন শিক্ষামূলক জায়গা।
বাইরে রয়েছে সুন্দর একটা বাগান, যেখানে বসে ছবি তোলা, হাওয়া খাওয়া বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো যায়। অনেক মানুষ সকালে ও বিকেলে হাঁটতে আসেন এখানে।
শীতকালে বাগানে বসে রোদ পোহানো, ছোটদের খেলাধুলা বা কাপলে ছবি তোলা খুব সাধারণ দৃশ্য। আর সন্ধ্যার সময় আলোয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল একেবারে রাজপ্রাসাদের মতো দেখতে লাগে।
এখানে মাঝে মাঝে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো হয়, যেখানে ইতিহাস গল্পের মতো শোনানো হয় — ছোট-বড় সবার জন্য দারুন অভিজ্ঞতা।
📍 জায়গা: জওহরলাল নেহরু রোড, কলকাতা
২. দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির
 |
| source- wikipedia |
এই মন্দিরে মা কালীকে পূজা করা হয়। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত পুজো দিতে আসেন। মন্দিরটি অনেক বড় এবং চারপাশে শান্ত পরিবেশ, তাই এখানে এলে মনে শান্তি পাওয়া যায়।
রামকৃষ্ণ পরমহংস এই মন্দিরেই সাধনা করতেন, তাই এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দিক থেকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর স্ত্রী শ্রীমা সারদাদেবীও এই জায়গার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই কারণেই জায়গাটি শুধু মন্দির নয়, একটা আধ্যাত্মিক কেন্দ্রও বটে।
মন্দিরের ঠিক পাশেই বয়ে চলেছে গঙ্গা নদী। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া খাওয়া, সিঁড়িতে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা — এসব মন ভালো করে দেয়। অনেকেই এখানে বসে প্রার্থনা করেন, ছবি তোলেন বা শুধু কিছুক্ষণ নিরিবিলিতে থাকেন।
বিশেষ করে পূর্ণিমা বা উৎসবের দিনে এখানে ভীষণ ভিড় হয়। তবে ভোরে বা সন্ধ্যার সময় এলে জায়গাটি অনেক শান্ত লাগে।
📍 জায়গা: দক্ষিণেশ্বর, কলকাতা
৩. কুমারটুলি
 |
| source- wikipedia |
কুমারটুলি হল কলকাতার সেই বিখ্যাত জায়গা, যেখানে মৃৎশিল্পীরা মাটি দিয়ে দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করেন। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজা — সব বড় উৎসবের প্রতিমা এখান থেকেই সারা কলকাতা, এমনকি বিদেশেও পাঠানো হয়।
এই জায়গায় হাঁটলে দেখা যায়, শিল্পীরা কীভাবে খালি হাতে মাটি গড়ে জীবন্ত প্রতিমা বানাচ্ছেন। কাঠের কাঠামো তৈরি থেকে রং দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিজের চোখে দেখা যায়। দুর্গাপূজার আগের সময়, বিশেষ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, এখানে সবচেয়ে বেশি কাজ চলে।
ছবি তুলতে ভালোবাসলে এই জায়গা একেবারে স্বপ্নের মতো — রঙিন প্রতিমা, শিল্পীদের ব্যস্ততা, আর চারপাশে গাঁদা ফুল আর আলপনার গন্ধ। এখানে গিয়ে শুধু ছবি তোলা নয়, বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু শেখা যায়।
ছোট ছোট গলির মাঝে এই জায়গাটা এমন একটা জগৎ, যেখানে প্রতিদিন নতুন কিছু তৈরি হচ্ছে — আর সেই সৃষ্টিই হয়ে উঠছে উৎসবের প্রাণ।
📍 জায়গা: শোভাবাজার, কলকাতা
৪. ইকো পার্ক
 |
| source- wikipedia |
ইকো পার্ক কলকাতার সবচেয়ে বড় ও সুন্দর বিনোদন পার্কগুলোর একটি। এই জায়গায় সব বয়সের মানুষ মজা করতে আসেন — ছোটদের দৌড়ঝাঁপ থেকে শুরু করে বড়দের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ, সবকিছুর জন্য এটা আদর্শ জায়গা।
পার্কের ভিতরে আছে অনেক কিছু — যেমন লেকের পাশে হাঁটার জায়গা, ছোট নৌকায় ঘোরা, সাইকেল চালানো, ফুলের বাগান, বিভিন্ন স্ট্যাচু আর ছোট ছোট থিম পার্ক। এখানে রয়েছে একটা সেভেন ওয়ান্ডার্স এলাকা, যেখানে বিশ্বের ৭টি আশ্চর্য জায়গার মডেল আছে।
শীতকালে ইকো পার্ক সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়, কারণ আবহাওয়া ভালো থাকে আর ফুলের রং যেন পার্কের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। পরিবার, বন্ধু, কাপল — সবাই এখানে সময় কাটাতে ভালোবাসে।
এছাড়া এখানে কনসার্ট, আর্ট এক্সিবিশন বা ফুড ফেস্টিভ্যালও মাঝে মাঝে হয়। চাইলে ইকো আইল্যান্ডেও যেতে পারো, যেখানে ক্যাফে আর সুন্দর বসার জায়গা আছে।
📍 জায়গা: নিউ টাউন, কলকাতা
৫. সায়েন্স সিটি
 |
| source- wikipedia |
সায়েন্স সিটি এমন একটা জায়গা যেখানে বিজ্ঞান শেখা যায় খেলতে খেলতেই। ছোট থেকে বড় – সবাই এখানে মজা পায়। স্কুলের প্রজেক্ট, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরা বা পরিবার নিয়ে ভালো একটা দিন কাটানোর জন্য এটি দারুন জায়গা।
এখানে রয়েছে অনেক রকম সেকশন — যেমন ডাইনোসরের গ্যালারি, স্পেস থিয়েটার, মিরর মেজ, টাইম মেশিন, 3D থিয়েটার, আর রোবটের প্রদর্শনী। বাচ্চারা এখানে বিভিন্ন খেলা ও এক্সপেরিমেন্টে অংশ নিতে পারে, যা ওদের বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে।
সবচেয়ে মজার জিনিসগুলোর মধ্যে আছে ‘আর্থ এক্সপ্লোরেশন হল’ আর ‘ডাইনামোশন’। এখানে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে অনেক কিছু বোঝা যায় — যেমন শব্দ, আলো বা চুম্বকের কাজ।
ছুটি বা উইকেন্ডে এখানে অনেক ভিড় হয়, তাই সকালে চলে এলে ভালো। এখানে বসার জায়গা, খাওয়ার জায়গা সবই আছে, তাই সারাদিন ঘুরেও ক্লান্ত লাগে না।
📍 জায়গা: ইএম বাইপাস, কলকাতা
৬. হাওড়া ব্রিজ
 |
| source- wikipedia |
হাওড়া ব্রিজ শুধু একটি ব্রিজ নয়, এটা কলকাতার গর্ব ও পরিচয়ের অংশ। এটি হুগলি নদীর ওপর তৈরি একটি বিশাল লোহার ব্রিজ, যা কলকাতার সঙ্গে হাওড়া শহরকে যুক্ত করে। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করেন — বাস, ট্যাক্সি, রিকশা, এমনকি পায়ে হেঁটে।
এই ব্রিজের আরেক নাম ‘রবীন্দ্র সেতু’, তবে সবার মুখে মুখে আছে হাওড়া ব্রিজ নামটাই। দিনে এটি যতটা ব্যস্ত থাকে, রাতে ততটাই সুন্দর হয়ে ওঠে — আলোয় আলোকিত হয়ে যেন একটা জীবন্ত ছবি হয়ে ওঠে।
ব্রিজের নিচে বয়ে চলেছে হুগলি নদী। কেউ কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, কেউ বা নৌকায় ওঠেন। মল্লিকঘাট ফুলবাজার এই ব্রিজের একদম কাছে, যা কলকাতার সবচেয়ে বড় ফুলের বাজার — এখানেও ঘুরতে যাওয়া যায়।
অনেক বাংলা ও হিন্দি সিনেমাতেও হাওড়া ব্রিজের দৃশ্য দেখা যায়, তাই এটা শুধু বাস্তব নয়, অনেকের স্বপ্নেরও অংশ।
📍 জায়গা: হাওড়া ও কলকাতার সংযোগস্থল
৭. ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম
 |
| source- wikipedia |
ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম হল ভারতের সবচেয়ে পুরনো ও বড় মিউজিয়ামগুলোর একটি। এই মিউজিয়ামে ঢুকলেই মনে হবে যেন ইতিহাসের মাঝে চলে এসেছি। এখানে রয়েছে মিশরের মমি, বিশাল ডাইনোসরের কঙ্কাল, পুরনো মুদ্রা, শিল্পকর্ম, প্রাচীন মূর্তি, পাথরের ফলক — আরও কত কী!
ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই জায়গাটা খুব শিক্ষামূলক। বিভিন্ন গ্যালারিতে ভাগ করে রাখা আছে — যেমন আর্কিওলজি (প্রত্নতত্ত্ব), জিওলজি (ভূবিজ্ঞান), বায়োলজি (জীববিজ্ঞান), এবং আর্ট। যাঁরা ইতিহাস আর বিজ্ঞান পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটা একেবারে সোনার খনি।
এখানে বাচ্চাদের জন্যও মজার জিনিস আছে — যেমন ডাইনোসর মডেল, প্রাকৃতিক ইতিহাসের ছবিগুলো, এবং নানা ধরণের প্রাণীর হাড়গোড়। যারা ফটোগ্রাফি ভালোবাসে, তাদের জন্যও এই জায়গাটা দারুণ।
শীতকালে অনেক স্কুলের পক্ষ থেকেও পিকনিক বা এডুকেশনাল ট্রিপ হয় এখানে।
📍 জায়গা: জওহরলাল নেহরু রোড, কলকাতা
৮. প্রিন্সেপ ঘাট
 |
| source- wikipedia |
প্রিন্সেপ ঘাট হলো হুগলি নদীর ধারে এক সুন্দর আর শান্ত জায়গা, যেখানে যেকোনো সময় ঘুরতে যাওয়া যায়। এই জায়গার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তার সাদা রঙের গ্রীক ধাঁচের স্মৃতিস্তম্ভ, যা ব্রিটিশ আমলে জেমস প্রিন্সেপের স্মরণে তৈরি হয়েছিল।
এখানে নদীর পাড় ধরে লং ওয়াক করা যায়, বেঞ্চে বসে হাওয়া খাওয়া যায়, আর চোখের সামনে দিয়ে নৌকা চলতে দেখা যায়। সন্ধ্যাবেলায় নদীর ওপারে সূর্য ডোবার দৃশ্য একদম মন ছুঁয়ে যায়।
যারা ছবি তুলতে ভালোবাসে, তাদের জন্য প্রিন্সেপ ঘাট স্বপ্নের মতো। বিয়ের প্রি-ওয়েডিং ফটোশুট থেকে শুরু করে ছোট ভিডিও — সবকিছুতেই এই জায়গা দারুণ লাগে।
এখানে ছোট ছোট ফুড স্টলও আছে, চা-বিস্কুট খেতে খেতে গঙ্গার হাওয়া খাওয়ার আলাদা মজা আছে। সন্ধ্যায় আলোয় আলোকিত এই জায়গা একেবারে রোমান্টিক আর শান্তিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
📍 জায়গা: গঙ্গার ধারে, বাবুঘাটের কাছাকাছি, কলকাতা
৯. জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি
 |
| source- wikipedia |
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মভবন এবং তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই বাড়িটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, বরং এটি বাংলা সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ভাবনার প্রতীক।
এই বাড়িতে ঢুকলেই মনে হবে যেন একেবারে অন্য এক সময়ে চলে গেছি। লাল রঙের প্রাচীন দোতলা বাড়ি, চওড়া বারান্দা, খোলা উঠোন — সব মিলিয়ে পুরোনো দিনের কলকাতার একটা ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
বাড়িটির মধ্যে রয়েছে একটি মিউজিয়াম, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত জিনিস, হাতে লেখা চিঠি, কবিতার পাণ্ডুলিপি, ছবি এবং তাঁর জীবনের নানা তথ্য প্রদর্শিত হয়। এই জায়গাটি রবীন্দ্র অনুরাগীদের জন্য এক আবেগের কেন্দ্র।
এখানে অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয় — যেমন পঁচিশে বৈশাখ, বিশ্বভারতীর অনুষ্ঠান ইত্যাদি।
যাঁরা বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসেন, তাঁদের জীবনে একবার হলেও এখানে আসা দরকার।
📍 জায়গা: গিরিশ পার্কের কাছাকাছি, উত্তর কলকাতা
১০. পার্ক স্ট্রিট
 |
| source- wikipedia |
পার্ক স্ট্রিটকে বলা হয় "কলকাতার নাইটলাইফের হার্টবিট"। এই রাস্তাটা একদিকে যেমন দিনের বেলা চুপচাপ অফিসপাড়ার মতো, ঠিক তেমনি সন্ধ্যা নামলেই জেগে ওঠে আলো, মিউজিক, আর খাবারের গন্ধে।
এখানে আছে কলকাতার সবচেয়ে পুরনো এবং জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট ও কেফে — যেমন পিটার ক্যাট, ফ্লুরিস, মোকার, বারবিকিউ, ইত্যাদি। পিটার ক্যাটের “চেটিনা ক্যাবাব” বা ফ্লুরিসের কেক খেতে বহু মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে আসেন।
শীতকালে, বিশেষ করে বড়দিন আর নিউ ইয়ার-এর সময়, পুরো পার্ক স্ট্রিট জুড়ে আলোকসজ্জা এমন হয় যে মনে হয় রূপকথার শহরে এসে পড়েছি। এই সময় পরিবার, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলা, স্ট্রিট ফুড খাওয়া, হালকা মিউজিক উপভোগ করা — সবার প্রিয়।
এছাড়া এখানকার কিছু জায়গায় জ্যাজ ও লাইভ মিউজিক শোনা যায়, যা পুরো পরিবেশটা আরও জমিয়ে তোলে।
📍 জায়গা: মধ্য কলকাতা, এসপ্ল্যানেড ও ক্যামাক স্ট্রিটের মাঝামাঝি
Darun 🫡❤️✨
ReplyDelete❤️❤️❤️
ReplyDelete